Home খুলনা বিভাগ ঝিনাইদহ-৩ আওয়ামী লীগে সক্রিয় ৩ গ্রুপ; বিএনপির ভরসা জামায়াত

ঝিনাইদহ-৩ আওয়ামী লীগে সক্রিয় ৩ গ্রুপ; বিএনপির ভরসা জামায়াত

জুলফিকার আলী, কোটচাঁদপুর (ঝিনাইদহ)ঃ ঝিনাইদহ-৩ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থী গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে দু’দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে স্থানীয়রা মনে করেন। তবে প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার উপর উভয় দলের জয় পরাজয় নির্ভর করছে।
দেশের সীমান্তবর্তী কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত ঝিনাইদহ-৩ আসন। এখানে মোট ভোটারের সংখ্যা ৩,৬০,৮৪৪ জন। মহেশপুর উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ২,৫২,০৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১,২৭,১৫২ জন ও নারী ভোটার সংখ্যা ১,২৪,৮৮৮ জন। কোটচাঁদপুর উপজেলার মোট ভোটার সংখ্যা ১,০৮,৮৪৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫৪,৫৬৭ জন ও নারী ভোটার সংখ্যা ৫৪,২৭৭ জন ।
এ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য নবী নেওয়াজ। তার দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা আছে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে। আসনটিতে তীব্র দলীয় কোন্দল আছে। ফলে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে চরম হতাশা বিরাজ করছে। বর্তমান এমপি ছাড়াও আওয়ামী লীগে সম্ভাব্য প্রার্থীর ছড়াছড়ি।
১৯৭৩ সালে জয় পেলেও পরের নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়। ১৯৭৯ সালে আইডিএল, ৮৬ তে জয় পায় জামায়াত। এরপর ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আসনটি দখলে রাখে বিএনপি। প্রায় ২৯ বছর পর, ২০০৮ সালে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। সবশেষ নির্বাচনেও জয় পায় দলটি।
ঝিনাইদহ-৩ আসনে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছেন। তাদের মধ্যে বর্তমান এমপি নবী নেওয়াজ, সাবেক সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট শফিকুল আজম খাঁন চ ল, মহেশপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাজ্জাতুজ জুম্মা, সাবেক কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের বন ও পরিবেশ উপ-কমিটির সদস্য রেজাউল করিম টিটোন, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আলী, কোটচাঁদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শরিফুননেছা মিকি, সাবেক সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য পারভীন তালুকদার মায়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা এম.এম জামান মিল্লাত, কেন্দ্রীয় আ’লীগ উপ-কমিটির সাবেক নেতা ইঞ্জিনিয়ার টি.এম আজিবর রহমান মোহন, জেলা কৃষক লীগ নেতা ও এস.বি.কে ইউপি’র সাবেক চেয়ারম্যান সাজ্জাদুল ইসলাম সাজ্জাদ।
অপরদিকে এই আসনে বিএনপির পক্ষে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিষয়ক সহ-সম্পাদক কণ্ঠশিল্পী মনির খান, কেন্দ্রীয় বিএনপির তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সহ-সম্পাদক আমিরুজ্জামান খাঁন শিমুল, ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব লতিফুর রহমান চৌধুরী বাবলু, মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোমিনুর রহমান মমিন এবং সাবেক এমপি শহিদুল ইসলাম মাস্টারের জৈষ্ঠ্য পুত্র মেহেদী হাসান রনি। এ ছাড়া জামায়াত থেকে জামায়াতের সুরা সদস্য অধ্যাপক মতিয়ার রহমান বিএনপির প্রার্থী হবেন বলে শোনা যাচ্ছে।
এছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে ব্যারিস্টার কামরুজ্জামান স্বাধীন, উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সাংবাদিক আব্দুর রহমান প্রার্থী হবেন বলেও শোনা যাচ্ছে।
এদিকে বিএনপির সঙ্গে জোটভিত্তিক নির্বাচন হলে আসনটি জামায়াতে ইসলামী চাইবে। একবার এ আসন থেকে জামায়াতের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে। গত সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে  নির্বাচনেও আসনটিতে জামায়াত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছিল। তাছাড়াও গত উপজেলা নির্বাচনে দুইটি উপজেলার মধ্যে দুইটিতেই জয়লাভ করেন জামায়াতের প্রার্থীরা। কিন্তু বিগত সপ্তম, অষ্টম ও নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছিল। এদিক থেকে বিএনপি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তাদের গলার কাঁটা হতে পারে জামায়াত। এ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান রয়েছে। তাই জামায়াত এ আসন বিএনপিকে আর ছাড় দিতে রাজি নয়।
১৯৭৩ সালে জয় পেলেও পরের নির্বাচনে আসনটি আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়। ১৯৭৯ সালে আইডিএল, ৮৬ তে জয় পায় জামায়াত। এরপর ১৯৯১ থেকে ২০০১ পর্যন্ত আসনটি দখলে রাখে বিএনপি। প্রায় ২৯ বছর পর ২০০৮ সালে আসনটি পুনরুদ্ধার করে আওয়ামী লীগ। সবশেষ নির্বাচনেও জয় পায় দলটি।
গত ৫টি নির্বাচনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৯৯১ সালের নির্বাচনে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯ ভোটের মধ্যে বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাস্টার পান ৬১ হাজার ৩৯১ ভোট। তার নিকটতম প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর এএসএম মোজাম্মেল পান ৪৪ হাজার ৮৬১ ভোট। আওয়ামী লীগের সাজ্জাতুজ জুম্মা পান ৩১ হাজার ৪১২ ভোট। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাস্টার পান ৬৫ হাজার ৭২৫ ভোট। তার নিকটতম জামায়াতে ইসলামীর এসএম মোজাম্মেল হক পান ৫৬ হাজার ৪৫ ভোট। আর আওয়ামী লীগের প্রার্থী সাজ্জাতুজ জুম্মা পান ৫০ হাজার ৮৮২ ভোট। ২০০১ সালের নির্বাচনে এই আসনে বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাস্টার পান ১ লাখ ২৭ হাজার ২৩ ভোট। তার নিকটতম আওয়ামী লীগের সাজ্জাতুজ জুম্মা পান ৮৪ হাজার ২৮৯ ভোট। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের শফিকুল আজম খাঁন চ ল পান ১ লাখ ১৮ হাজার ৩৬১ ভোট। আর জামায়াতে ইসলামীর মো. মতিয়ার রহমান পান ৮১ হাজার ৭৩৯ ভোট। বিএনপির শহিদুল ইসলাম মাস্টার পান ৫৯ হাজার ১৫ ভোট। সর্বশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নবী নেওয়াজ পান ৪৬ হাজার ১০৫ ভোট। আর নিকটতম প্রার্থী জাতীয় পার্টির কামরুজ্জামান স্বাধীন পান ১ হাজার ৪৬৫ ভোট।
বর্তমান এমপি নবী নেওয়াজ আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন এবারও আমি মনোনয়ন পাবো বলে অনেক আশাবাদী। গত ৫ বছর আমি এলাকার উন্নয়ন ও সাধারন মানুষের সেবা প্রদানের জন্য আমার জান প্রাণ দিয়ে কাজ করেছি। তা মানুষ স্বীকার করে। আমার সময়ে আমি সাধারন মানুষকে নির্যাতন ও মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করিনি। যেহেতু আমি এলাকায় কোন রকম বিশৃঙ্খলা করিনি সেহেতু আমি আশাবাদী মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে। আমি মনোনয়ন পেলে নৌকাকে আবারও জয়ী করে উপহার দিতে পারবো বলে মনে করি। আমি জনগনের সাথে ছিলাম ও থাকবো।
সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আ.লীগের সাবেক সহ-সভাপত্বি এ্যাডভোকেট শফিকুল আজম খাঁন চ ল বলেন, আমি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ছিলাম, আছি ও থাকব। তিনি আরো বলেন, আমি তৃণমূল থেকে উঠে আসা বঙ্গবন্ধুর একজন আদর্শিক কর্মী। আমি ১৯৯৯ ও ২০০৪ সালে আওয়ামী লীগের পক্ষ্যে মহেশপুর পৌরসভার মেয়র পদে নির্বাচন করি এবং বিপুল ভোটের ব্যাবধানে জয়লাভ করি । ১৫ বছর জনপ্রতিনিধি হিসেবে জনগণের সেবা করেছি। গত ৫ বছরও আওয়ামী লীগের কর্মী হিসেবে জনগণের পাশে আছি। মহেশপুর ও কোটচাঁদপুরের সকল নেতাকর্মীদের সাথে ছিলাম। কখনও আমি জনবিচ্ছিন্ন হইনি। জননেত্রী শেখ হাসিনাকে আবারো ক্ষমতায় আনার জন্য নির্বাচনী এলাকায় আওয়ামী লীগ সরকারের গত ১০ বছরের  উন্নয়নের প্রচার করে যাচ্ছি।  আমি নিজের মনোনয়ন নিয়ে চিন্তিত নই। আমি দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের সঙ্গে আছি। আর যেহেতু দলীয় সভানেত্রী বলেছেন যে নেতা তৃণমূলসহ সাধারণ জনগণের আস্থাভাজন ও জনপ্রিয় তাকেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে। দলের নিপীড়িত নির্যাতিত ত্যাগী নেতাদের সঙ্গে নিয়ে আমি দলীয় কর্মকান্ড চালিয়ে যাচ্ছি। আমাকে মনোনয়ন দিলে নৌকাকে জয়ী করে এ আসনটি জননেত্রী শেখ হাসিনা কে উপহার দিতে পারবো বলে আমি আশাবাদী ।
এদিকে আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে জানতে চাইলে মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি আলহাজ্ব লতিফুর রহমান চৌধুরী বাবলু বলেন,আমি বহুদিন ধরে রাজনীতি করি। আমি এলাকায় উন্নয়ন করার জন্য,সাধারণ জনগণের পাশে থাকতে চাই। দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয় তাহলে আমি নির্বাচনে জয় পাবো বলে আশা করি। তাছাড়া আমি মনে করি ‘ব্যক্তির আগে দল, দলের আগে দেশ’, এই চিন্তা করে দল যাকেই মনোনয়ন দেবে আমরা তার জন্য কাজ করবো এবং তাকে জিতিয়ে আনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করবো।
মহেশপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার মোমিনুর রহমান মমিন বলেন, আমি তৃণমূলের সাথে সবসময় ছিলাম এবং আছি। দল থেকে যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়া হয় তাহলে আমি নির্বাচনে জয় ছিনিয়ে আনতে পারবো বলে মনে করি। আমি কলেজ জীবনে ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলাম। আমি বিভিন্ন সময়ে দল ও দেশের স্বার্থে বিভিন্ন আন্দোলনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছি,আমি বিভিন্ন হামলা মামলারও স্বীকার হয়েছি। আমরা সকল প্রার্থী একসাথে বসে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে, দল যাকেই মনোনয়ন দেবে আমরা একজোট হয়ে তার জন্য কাজ করবো।
স্থানীয়রা জানান, আমরা চাই যে প্রার্থী সুখে দুঃখে জনগণের পাশে সবসময় থাকবে এবং জনপ্রতিনিধি হিসেবে গ্রহনযোগ্য ও নিরাপদ সেই প্রার্থীকেই আমরা সংসদ সদস্য হিসাবে নির্বাচিত করতে চাই।